একটি নদীর আত্মকথা — প্রবন্ধ
আমি একটি নদী। জন্ম আমার পাহাড়ের কোলে, ঝরনার কলকল ধ্বনির মাঝে। বরফগলা জল আর মেঘের অশ্রু মিলিয়ে আমার প্রথম স্রোতধারা সৃষ্টি হয়। তখন আমি ছিলাম ক্ষীণ, সরু ও লাজুক। পাহাড়ের বুকে ছোট ছোট পাথরের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে, সবুজ অরণ্যের ফাঁক দিয়ে আমি নেমে আসতাম সমতলের দিকে। আমার সেই শৈশব ছিল চঞ্চল ও সুরম্য।
পাহাড় ছেড়ে যখন সমতলে এলাম, তখন আমার যৌবন শুরু হলো। আমি হয়ে উঠলাম প্রশস্ত, গভীর ও প্রমত্তা। আমার দুই তীর জুড়ে গড়ে উঠল জনপদ, ক্ষেত-খামার, গ্রাম ও শহর। কৃষকের জমিতে আমি উর্বরতা বয়ে আনলাম, জেলে আমার বুকে জাল ফেলল, নৌকা ভেসে চলল আমার স্রোতের উপর। আমার জলে স্নান করে মানুষ পবিত্রতা অনুভব করল, আমার তীরে উৎসব হলো, গান গাওয়া হলো। মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ—সবকিছুর সাক্ষী আমি।
বর্ষাকালে আমি রূপ বদলাই। তখন আমি উচ্ছ্বসিত, কখনও কখনও ভয়ংকর। অতিবৃষ্টিতে আমার জল বেড়ে যায়, আমি তীর ছাপিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ি। মানুষ তখন আমাকে ভয় পায়, আমাকে দোষ দেয়। কিন্তু আমি তো প্রকৃতির নিয়ম মেনেই চলি। কখনও বন্যা এনে ধ্বংস করি, আবার সেই বন্যার জলেই জমি হয় আরও উর্বর। সৃষ্টি আর ধ্বংস—দুটোই আমার স্বভাবের অংশ। শীতকালে আমি শান্ত ও স্থির। আমার স্রোত কমে আসে, জেলেরা তখন স্বস্তিতে মাছ ধরে, শিশুরা তীরে খেলাধুলা করে। পাখিরা আমার জলে ভেসে বেড়ায়। আমি যেন তখন ধ্যানমগ্ন, নিজের দীর্ঘ যাত্রার কথা ভাবি। কত সভ্যতা আমার তীরে জন্ম নিয়েছে, কত ইতিহাস রচিত হয়েছে—সবই আমার স্মৃতিতে অম্লান। কিন্তু আজ আমি কষ্ট পাই। মানুষ আমার জলে আবর্জনা ফেলে, কলকারখানার বর্জ্য ঢেলে আমাকে দূষিত করে। আমার স্বচ্ছ নীল জল আজ অনেক জায়গায় কালো ও মলিন। মাছ কমে যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। আমার বুকের উপর বাঁধ তৈরি করে আমার স্বাভাবিক প্রবাহ থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি যেন ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ছি। তবুও আমি আশাবাদী। কারণ আমি জানি, মানুষ সচেতন হলে আমাকে রক্ষা করতে পারবে। আমাকে পরিষ্কার রাখলে, আমার তীর সবুজ রাখলে, আমিও চিরকাল জীবন ও উর্বরতা বিলিয়ে যেতে পারব। আমার শেষ গন্তব্য সাগর—সেখানে গিয়ে আমি মিশে যাই অসীমের সঙ্গে। কিন্তু আমার যাত্রা কখনও থামে না। জল হয়ে আবার মেঘে ফিরি, মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে আবার জন্ম নিই। আমি একটি নদী। আমার স্রোত জীবনের প্রতীক—চলমান, চিরন্তন ও অমর।